নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: সৃজনশীলতা আর প্রতিভার জয়গানে মুখরিত হলো কলকাতার লীলা ভবন। ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫, বুধবার বিকেলে এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পালিত হলো ইন্টারন্যাশনাল নিউস্টার পরিচালিত বেঙ্গলি শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ও সাহিত্য সম্মাননা। প্রান্তিক অঞ্চলের শিল্পীদের মূলধারার মঞ্চে তুলে ধরার যে অঙ্গীকার নিয়ে এই সংস্থার পথচলা, এই অনুষ্ঠান যেন ছিল তারই এক সার্থক প্রতিফলন।
উপস্থিত নক্ষত্ররা
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী বাদল সরকার (প্রোগ্রাম ডিরেক্টর, ইন্টারন্যাশনাল নিউস্টার), বিশিষ্ট অভিনেতা ও লেখক বাদল বর্মন, প্রখ্যাত জুরিজাজ বাবু রায় এবং আনন্দ চক্রবর্তী। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন রাষ্ট্রপতি পুরস্কার প্রাপ্ত শিক্ষক ও শিল্পী ইন্দ্রনীল মুখার্জি, চলচ্চিত্র অভিনেত্রী ও গায়িকা সমৃদ্ধা চক্রবর্তী, বিশিষ্ট আইনজীবী অনিল কুমার দাস, এবং সাহিত্যিক ও বাচিক শিল্পী দীপঙ্কর মজুমদার। মঞ্চ আলো করে উপস্থিত ছিলেন জয়ন্ত মন্ডল, সমীর ব্যানার্জি, রাজকুমার সেন এবং নৃত্যগুরু স্বস্তিক-সহ আরও অনেক গুণী ব্যক্তিত্ব।
শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল: সেরার লড়াই
এবারের চলচ্চিত্র উৎসবে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা ছিনিয়ে নিয়েছে নিচের চলচ্চিত্রগুলি:
-
প্রথম স্থান: ‘উল্টো রাজার দেশ’ (পরিচালক: ঋষভ দত্ত)
-
দ্বিতীয় স্থান: ‘অনর্থ’ (পরিচালক: ত্রিবিক্রম বেরা অন্তিম)
-
তৃতীয় স্থান: ‘ভ্যানিশ’ (পরিচালক: মৃত্যুঞ্জয় রায়)
বিশেষ বিভাগীয় পুরস্কার:
উৎসবের মঞ্চে একক কৃতিত্বের জন্য সম্মানিত করা হয় বেশ কয়েকজন শিল্পী ও কলাকুশলীকে। উল্লেখযোগ্য বিজয়ীরা হলেন:
-
সেরা অভিনেতা ও পরিচালক: উত্তম বসাক ও ত্রিবিক্রম বেরা অন্তিম (‘অনর্থ’ ছবির জন্য)।
-
সেরা অভিনেত্রী: ভারতী পাল (‘শান্তিপুরের ডাইনি’)।
-
সেরা স্টোরি ও স্ক্রিপ্ট: ঋষভ দত্ত ও মৃত্যুঞ্জয় রায়।
-
সেরা শিশু শিল্পী: সৌম্যরূপ (‘ইচ্ছেপূরণ’)।
সাহিত্য সম্মাননা ও সমাজসেবা
কেবল চলচ্চিত্র নয়, সাহিত্যের আঙিনাতেও এদিন সম্মাননা প্রদান করা হয়। সেরা লেখকের শিরোপা পান অসীম ভুঁইয়া, সেরা সম্পাদকের সম্মান পান রুহুল আমিন। এছাড়া সেরা পত্রিকা হিসেবে ‘দুষ্টু পত্রিকা’ (সঞ্চিতা সিকদার) এবং সেরা সাহিত্য সংগঠন হিসেবে সমীর মুখার্জিকে পুরস্কৃত করা হয়। কবিতা প্রতিযোগিতায় “স্বপ্ন ও সংগ্রাম” বিষয়ে প্রথম স্থান অধিকার করেন পম্পা ঘোষ।
উদ্যোক্তার বক্তব্য
ইন্টারন্যাশনাল নিউস্টার-এর নেপথ্য কারিগর ও প্রতিষ্ঠাতা সৌমেন সেন তাঁর সমাপনী বক্তব্যে সংগঠনের মূল দর্শন তুলে ধরেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে জানান, “আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য হলো গ্রামবাংলার প্রান্তিক ও অবহেলিত জনপদে ছড়িয়ে থাকা সুপ্ত প্রতিভাদের বিশ্বমঞ্চের আলোয় নিয়ে আসা এবং তাদের সৃজনশীল সত্তাকে একটি সুনির্দিষ্ট ও পেশাদার দিশা প্রদান করা।” উল্লেখ্য যে, তাঁর সুযোগ্য সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘আন্তর্জাতিক নবনক্ষত্র’ সাহিত্য পত্রিকাটিও বর্তমানে নবীন ও প্রবীণ সাহিত্যিকদের মিলনস্থলে পরিণত হয়েছে, যা সাংস্কৃতিক জগতে এক উজ্জ্বল মাইলফলক।
নান্দনিক সমাপ্তি
অনুষ্ঠানের শেষলগ্নে মঞ্চস্থ হয় এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বাচিক শিল্পীদের উদাত্ত কণ্ঠের কবিতা পাঠ এবং গুণী সংগীতশিল্পীদের সুরের মূর্ছনা উপস্থিত দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে। সমবেত দর্শক ও সংস্কৃতিপ্রেমীরা এই মহতী উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, কলকাতার বুকে আয়োজিত এই বেঙ্গলি শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ও সাহিত্য সম্মাননা আগামী দিনে বাংলা চলচ্চিত্র এবং সাহিত্যের মানচিত্রকে কেবল সমৃদ্ধই করবে না, বরং নতুন প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণার এক নতুন উৎস হয়ে উঠবে। আয়োজকদের পক্ষ থেকে আশা প্রকাশ করা হয়েছে যে, আগামী বছরগুলোতে এই উৎসব আরও বৃহৎ ও আন্তর্জাতিক আঙ্গিকে আত্মপ্রকাশ করবে।