আপনার ছোট ব্যবসার রেজিস্ট্রেশন করবেন কী ভাবে? জেনে নিন প্রতিটি পদক্ষেপ

আমাদের দেশে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য ব্যবসা নিবন্ধীকরণ বাধ্যতামূলক নয়। তবে ব্যাঙ্কের ঋণ, সরকারি প্রকল্পের সুবিধা বা ট্যাক্সে ছাড় পাওয়ার জন্য প্রয়োজন ব্যবসা নিবন্ধীকরণ বা বিজনেস্ রেজিস্ট্রেশন। বর্তমানে উদ্যোগ আধারের মাধ্যমে ঘরে বসেই অনলাইনে এই রেজিস্ট্রেশন করা সম্ভব। এছাড়া অফলাইনেও জেলা শিল্প কেন্দ্রের অফিসে গিয়ে রেজিস্ট্রেশন করা যেতে পারে।
ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি ব্যবসা কোনগুলি

মাইক্রো, স্মল ও মিডিয়াম এন্টারপ্রাইস্ অ্যাক্ট অনুসারে এমএসএমই ব্যবসাগুলোকে দুইটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে- উত্পাদনমুখী ব্যবসা ও পরিষেবা প্রদানকারী ব্যবসা। এই দুইধরণের ব্যবসাই আবার ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি এই তিনভাগে বিভক্ত। ব্যবসায়িক মূলধন বা ব্যবসায় বিনিয়োগের ওপর নির্ভর করে এই ভাগগুলি করা হয়ে থাকে।
উত্পাদনমুখী ব্যবসা
যেসব ব্যবসা পণ্য উত্পাদন করে সেগুলিকে বলা হয় উত্পাদনমুখী ব্যবসা। উত্পাদনমুখী ব্যবসার ক্ষেত্রে প্ল্যান্ট ও মেশিনারি অর্থাত্ কারখানা এবং যন্ত্রাদিরে বিনিয়োগ করা পুঁজির ভিত্তিতে ব্যবসাগুলোকে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি বলে চিহ্নিত করা হয়। যেসব উত্পাদনমুখী ব্যবসার কারখান ও যন্ত্রাদিতে প্রাথমিক বিনিয়োগ ২৫ লক্ষ টাকার কম সেগুলিকে ক্ষুদ্র ব্যবসা হিসবে পরিগণিত করা হয়, যেসব ব্যবসায়ে এই বিনিয়োগের পরিমাণ ২৫ লক্ষ টাকার বেশি কিন্তু ৫ কোটি টাকার কম সেই ব্যবসাগুলোকে চিহ্নিত করা হয় ছোট ব্যবসা হিসেবে এবং এই বিনিয়োগ ৫ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা হলে তা মাঝারি ব্যবসা হিসেবে পরিগণিত হবে।
আরো পড়ুন: বিনিয়োগকারী ও ঋণদাতাদের মন মতো একটি বিজনেস প্ল্যান লিখবেন কী ভাবে?
পরিবেষা প্রদানকারী ব্যবসা
এই ব্যবসায় ইক্যুইপমেন্ট বা যন্ত্রাংশে বিনিয়োগ করা মূলধনের ভিত্তিতে ব্যবসাগুলোকে তিনভাগে ভাগ করা হয়। ক্ষুদ্র ব্যবসার ক্ষেত্রে এই বিনিয়োগ হবে ১০ লক্ষ টাকার কম, বিনিয়োগ ১০ লক্ষের বেশি কিন্তু ২ কোটি টাকার কম হলে তাকে ছোট ব্যবসা হিসেবে ধরা হবে, আর এই বিনিয়োগের পরিমাণ যদি ২ কোটি টাকার বেশি হয় কিন্তু ৫ কোটি না ছাড়ায় তাহলে সেই ব্যবসাকে মাঝারি ব্যবসা হিসেবে চিহ্নিত করা হবে।
উদ্যোগ আধার থাকলে যে যে সুবিধাগুলি পাওয়া যাবে
১. ব্যাঙ্ক ঋণের ক্ষেত্রে স্বল্প হারে ঋণ পাওয়া যাবে ( সাধারণের থেকে ১ থেকে ১.৫ শতাংশ কম হারে ঋণ পাওয়া যায়)। কোনও কোল্যাটারাল ছাড়াই ব্যাঙ্ক ঋণ পাওয়া সম্ভব।
২. ট্যাক্সে ছাড় পাওয়া যাবে।
৩. নির্দিষ্ট কিছু সরকারি টেন্ডারের শুধুমাত্র নিবন্ধীকৃত ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীরাই অংশগ্রহণ করতে পারেন।
৪. বারকোড রেজিস্ট্রেশনে ছাড় পাওয়া যায়।
৫. স্ট্যাম্প ডিউটি ও রেজিস্ট্রেশন ফি মকুব হয়।
৬. বিদ্যুতের বিলে ছাড় পাওয়ার সুযোগ।
৭. পেটেন্ট রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ ছাড়।
৮. আবগারি শুল্কে অব্যহতি
৯. বিদেশে ব্যবসার জন্য ভারত সরকারের সহায়তা পাওয়ার সুযোগ।
১০. ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিমের সুযোগ।
এছাড়াও বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার জন্যও প্রয়োজন এই রেজিস্ট্রেশন। সম্পূর্ণ বিনামূল্যেই উদ্যোগ আধার রেজিস্ট্রেশন সম্ভব। নতুন এই ব্যবস্থায় রেজিস্ট্রেশন হয় দ্রুত ও ঝঞ্ঝাটহীন। আধার ও প্যান ছাড়া অন্য কোনও নথিরও প্রয়োজন নেই। কোনওরকম কাগজপত্র জমা দেওয়ারও প্রয়োজনীয়তা নেই এই ব্যবস্থায়।
আরো পড়ুন: ৩৫ টি অল্প টাকায় ব্যবসার আইডিয়া যা আপনি শুরু করতে পারবেন আজই
অনলাইনে উদ্যোগ আধার নিবন্ধীকরণ প্রক্রিয়া

ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা যাতে সহজেই তাদের ব্যবসার রেজিস্ট্রেশন করাতে পারেন সেই উদ্দেশ্যে, ২০১৫ সাল থেকে উদ্যোগ আধার রেজিস্ট্রেশন চালু করে ভারত সরকার। এই পদ্ধতিতে ব্যবসার নিবন্ধীকরণ পদ্ধতি হয়েছে সহজ ও এতে সময়েও লাগে কম। জেনে নিন অনলাইনে উদ্যোগ আধার রেজিস্ট্রেশনের পদক্ষেপগুলি।
১. উদ্যোগ আধারের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট Udyog Aadhar Registration এ যান।

২. প্রথমেই আপনাকে দিতে হবে আপনার ১২ সংখ্যার আধার নম্বরটি। যেসব ব্যবসায়ীর আধার কার্ড রয়েছে শুধুমাত্র তারাই বর্তমানে অনলাইনে উদ্যোগ আধার রেজিস্ট্রেশনের সুবিধা পাবেন।
প্রপরাইটারশিপের ক্ষেত্রে আবেদনকারীর আধার নম্বরই দিতে হবে। পার্টনারশিপ ব্যবসার ক্ষেত্রে পার্টনারের আধার নম্বর ব্যবহার করা যাবে, কোম্পানির ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে হবে ডিরেক্টরের আধার নম্বর ও লিমিটেড লায়াবিলিটিস্ পার্টনারশিপের ক্ষেত্রে মনোনীত (ডেসিগনেটেড) পার্টনারদের আধার নম্বর ব্যবহার করা যেতে পারে।
আধার নম্বর দেওয়ার পর এরপর “Validate & Generate OTP” তে ক্লিক করুন। আপনার আধার নম্বরের সঙ্গে লিঙ্ক করা রেজিস্টার্ড নম্বরে আপনি একটি ওটিপি পাবেন। এই ওটিপি-টি দিলেই আপনার ব্যবসার নিবন্ধীকরণ শুরু হবে। জানতে চাওয়া হবে আপনি কোন ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত- জেনারেল, তফশিলি জাতি-উপজাতি নাকি অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি। জানাতে হবে লিঙ্গ পরিচয়। আপনার কোনও শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকলে তাও জানাতে হবে এই ফর্মে।
৩. এরপর আপনাকে আপনার ব্যবসা সংক্রান্ত তথ্য দিতে হবে। প্রথমেই দিতে হবে কোম্পানির নাম। জানাতে হবে কী ধরণের ব্যবসা এটি (প্রপরাইটি, হিন্দু আনডিভাইডেড ফ্যামিলি, পার্টনারশিপ, কো-অপারেটিভ, প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি, পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি, সেল্ফ হেল্প গ্রুপ, অন্যান্য এই বিকল্পগুলো থেকে উপযুক্তটি বেছে নিতে হবে), সঙ্গে দিতে হবে প্যান নম্বর। মনে রাখবেন আপনি যদি একাধিক ব্যবসার মালিক হন তাহলে প্রতিটি ব্যবসার জন্য পৃথকভাবে উদ্যোগ আধার রেজিস্ট্রেশন করাতে হবে। একই আধার নম্বর দিয়ে একাধিক উদ্যোগ আধার পাওয়া যেতে পারে।
৪. ব্যবসার সম্পূর্ণ ঠিকানা, ফোন নম্বর ও ই-মেল অ্যাড্রেস দিতে হবে।
৫. আপনার ব্যবসাটি কবে শুরু হয়েছে তা জানাতে হবে। আগে কোনওরকম রেজিস্ট্রেশন করে থাকলে সেই বিষয়ে যাবতীয় তথ্যও দিতে হবে।
৬. দিতে হবে আপনার ব্যবসার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নম্বর ও আপনার ব্যাঙ্কের শাখার আইএফএসসি কোড।
৭. এর পর আপনার ব্যবসা উত্পাদনমুখী নাকি পরিষেবা প্রদানকারী তা সিলেক্ট করুন।
৮. ন্যাশনাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল ক্লাসিফিকেশন হ্যান্ডবুক অনুসারে আপনার ব্যবসার জন্য উপযুক্ত এনআইসি কোডটি সিলেক্ট করুন।
৯. আপনার ব্যবসায় বিনিয়োগের পরিমাণ ও কর্মী সংখ্যা কত জন দিতে হবে সেই তথ্য। এক্ষেত্রে প্ল্যান্ট ও মেশিনারি বা ইক্যুইপমেন্টে বিনিয়োগের পরিমাণ দেবেন, জমি বা বিল্ডিংয়ের মূল্য দেওয়ার দরকার নেই।
১০. এর পর তালিকা থেকে আপানার ব্যবসার জন্য প্রযোজ্য জেলা শিল্প কেন্দ্রটি (ডিআইসি) বেছে নিন। আপনার ব্যবসা যে এলাকায় অবস্থিত সেই এলাকার জেলা শিল্প কেন্দ্রটি সিলেক্ট করুন। এই ফর্মটি অনলাইনে সাবমিট করলে আরও একবার আপনার মোবাইলে একটি ওটিপি আসবে। সেই ওটিপি দিলে আপনার আবেদন সম্পূর্ণ হবে। এরপর ২৪ ঘন্টার মধ্যে ই-মেল মারফত্ আপনি পেয়ে যাবেন আপনার উদ্যোগ আধার।
আরো পড়ুন : ২৬ টি লাভজনক ব্যবসা আইডিয়া যা আপনি শুরু করতে পারবেন মাত্র ১০ হাজার টাকায়
অফলাইনে উদ্যোগ আধার নিবন্ধীকরণ প্রক্রিয়া
যেসব ব্যবসায়ীর আধার কার্ড নেই তারা স্থানীয় জেলা শিল্প কেন্দ্রে উদ্যোগ আধারের জন্য আবেদন জানাতে পারেন। আবেদনের প্রক্রিয়াটি নিম্নরূপ।
১. আপনার আধার কার্ডের জন্য আবেদন করুন।
২. সংশ্লিষ্ট জেলা শিল্প কেন্দ্র (ডিআইসি) বা এমএসএমই-ডিআই-তে আধার এনরোলমেন্ট আইডি স্লিপ বা আধার এনরোলমেন্টের আবেদনের নথি এবং ঠিকানার প্রমাণ পত্র জমা দিন।
৩. জেলা শিল্প কেন্দ্র বা এমএসএমই-ডিআইতে পাওয়া যাবে উদ্যোগ আধারের ফর্ম। উপরে বর্ণিত অনলাইন ফর্মের মতোই যাবতীয় তথ্য পূরণ করে জমা দিন।
৪. ফর্ম জমা দিলে আপনাকে একটি অ্যাকনলেজমেন্ট পত্র দেওয়া হবে। এরপরে আপনার দেওয়া ইমেল আইডিতে পৌঁছে যাবে আপনার উদ্যোগ আধার নম্বর।
উদ্যোগ আধারের তথ্য সম্পাদনা
সহজেই অনলাইনে আপনি আপনার উদ্যোগ আধারের তথ্য সম্পাদন করতে পারেন। উদ্যোগ আধার সম্পাদন লিঙ্ক এ গিয়ে আপনার উদ্যোগ আধার নম্বরটি দিন। এরপর মোবাইল বা ইমেলের মারফত্ আপনি একটি ওটিপি পাবেন। সেই ওটিপি দিলেই আপনি আপনার উদ্যোগ আধারের সঙ্গে যুক্ত যাবতীয় তথ্য প্রয়োজন মতো সম্পাদন করতে পারবেন।
ভারতের মতো প্রগতিশীল দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি দেশের ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প। এই শিল্পের বিকাশ ঘটাতে নানা প্রকল্প এনেছে কেন্দ্রীয় সরকার। উদ্যোগ আধারও সেই প্রচেষ্টারই একটি অংশ। আপনার ছোট ব্যবসাকে উদ্যোগ আধারে রেজিস্টার্ড করে সেই সব প্রকল্পের সুযোগ নিন ও ব্যবসা বৃদ্ধি করুন।
Others News





